জহিরুল ইসলাম লাল : :
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে রাজধানীর হাতিরঝিলের আদলে দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতু নির্মাণ কাজে ধীরগতির কারণে জনসাধারণের মধ্যে চরম হতাশা দেখা দিয়েছে ।
অন্যদিকে উপজেলাবাসীর বহুল প্রত্যাশিত সেতুটির কাজ মন্থর গতিতে চলার কারনে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন লক্ষাধিক জনসাধারণ ।
৬০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১১.২৫ মিটার প্রস্থের এই আর্চ সেতুর কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ।
কিন্তুু স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ গত দেড় বছরেও সেতুটির ৫০ ভাগ কাজও সম্পন্ন হয়নি।
এমতাবস্থায় নির্মাণ কাজের দায়িত্বে থাকা কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, এ পর্যন্ত ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বাকি ৪০ ভাগ কাজ আগামী বছরের এপ্রিল মাসের মধ্যে শেষ হলে সেতু্টি পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেতুটির নলজুর নদীর দুই তীরে দুইটি অ্যাবাটমেন্টের মধ্যে পূর্ব পাড়ের একটি অ্যাবাটমেন্টের নীচ অংশে ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। এর বিপরীতে পশ্চিম তীরের অ্যাবাটমেন্টের কাজ সবেমাত্র শুরু হয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল বিভাগের সবচেয়ে বড় স্থাপনা জগন্নাথপুরে নির্মাণাধীন এই আর্চ সেতু। এ সেতুটি বৃহত্তর সিলেট বিভাগের একমাত্র আর্চ সেতু। স্থানীয় সংসদ সদস্য পরিকল্পনামন্ত্রী এম. এ মান্নান জগন্নাথপুর পৌরশহরে নলজুর নদীর উপর রাজধানীর হাতির ঝিলের আদলে এই দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি একনেকে অনুমোদন পায়।
২০২২ সালের ২৪ জানুয়ারি ১৩ কোটি ৪২ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয়ে নলজুর নদীর উপর মধ্যভাগে ৬০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১১.২৫ মিটার প্রস্থ এই আর্চ সেতুর অনুমোদন হয়।
সেতুতে দু-পাশে থাকবে ফুটপাত ও লাইটিং, মধ্যস্থানে কোন পিলার থাকবেনা। নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ফাঁক রেখে দু’পাশের দুটি অ্যাবাটমেন্টের মাধ্যমে ইস্পাত দিয়ে সেতুটি দৃশ্যমান হবে।
২০২২ইং সনের ২২ আগস্ট আর্চ সেতুটির কার্যাদেশ হলেও ৮ মাস পরে
চলতি বছরের মার্চ মাসে কিশোরগঞ্জের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স ‘ভাটি বাংলা এন্টারপ্রাইজ’ এ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করে। স্হানীয় এমপি পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান ২৬ শে মার্চ আনুষ্ঠানিক ভাবে সেতুটির কাজ উদ্বোধন করেন।
ভাটি বাংলা এন্টারপ্রাইজের কর্নধার
ইফতেখার মাহমুদ শাহিনকে সেতুটির সাইটে কখনও দেখা যায়নি। তবে এ সেতুটিতে নিম্ন মানের পাথর ও রড ব্যবহার করা হচ্ছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন।
টিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির ফলে
সেতুটির কাজ ও ধীরগতিতে চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে । ফলে নদীর দুপারের মানুষ চলাচলে চরম দূর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তাছাড়া সবধরনের যানবাহন পারাপারে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সহ মালবাহী ভারি ট্রাক না আসায় নিত্যপন্যের মূল্য ভয়াবহ আকার ধারন করেছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরে সেতুর কাজ সম্পন্ন করার সময়সীমা নির্ধারিত হওয়ার কথা থাকলেও যথাসময়ে কাজ শুরু না করা, নদীতে পানি আসা সহ নানা কারণে এর সময়সীমা আগামী বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত গড়ায়।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, এর সময়সীমা এপ্রিল মাস পর্যন্ত বর্ধিত হলেও আশা করা যায় ফেব্রুয়ারি মাসে উক্ত সেতুটি দৃশ্যমান হবে।
জানা গেছে, জগন্নাথপুর পৌরশহরে প্রবেশের প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম খাদ্যগুদামের উক্ত সেতুটি।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের আমলে সুনামগঞ্জের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার মোশাহিদ আহমদ চৌধুরীর প্রচেষ্টায় খাদ্যগুদাম সংলগ্ন নলজুর নদীর উপর খুবই মজবুত এবং টেকসই সেতু নির্মান করা হয়। কিন্তু সেতুটি সরু থাকায় একেবারে ঝকঝকে ওই সেতুটি অপসারণ করে এখানে নির্মিত হচ্ছে আর্চ সেতু।
জনসাধারণের সাময়িক সমস্যা নিরসনে নির্মাণাধীন সেতুর পাশ্ববর্তী স্থানে অস্থায়ীভাবে জোড়াতালি দিয়ে ডাইভারশন সেতু নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ওই সেতু ও ডাইভারশন সড়ক সরু থাকার কারণে ইতোপূর্বে দেবে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ ডাকবাংলো সেতু দিয়ে মালবাহী ভারী যানবাহন ঝুকিঁ নিয়ে চলাচল করছে।
ফলে পৌরশহরে প্রতিদিন লেগে আছে তীব্র যানজট। ফলে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাচ্ছে নানা দুর্ঘটনা। এতে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন এলাকাবাসী ও পথচারীরা। তাই দ্রুত আর্চ সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় জনসাধারণ।
স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, তদারকির অভাব ও জবাবদিহি না থাকায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে মন্থরগতিতে সেতু নির্মাণের কাজ চলছে।
জগন্নাথপুর পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল হক বলেন, জগন্নাথপুর পৌরশহরে যাতায়াতে প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম ছিল খাদ্যগুদামের সেতু। ওই সেতু ভেঙে দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতু নির্মাণ হচ্ছে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটি নির্মাণে গড়িমসি করায় জগন্নাথপুরবাসী চরম ভোগান্তিতে আছেন।
সেতু নির্মানে নিম্ন মানের পাথর রড লাগানো হচ্ছে। পানি দিয়ে পরিস্কার না করে ময়লা যুক্ত পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। তাদের গাফিলতি ও খামখেয়ালীপনায় এলাকাবাসী খুবই কষ্টে আছেন।
প্রাক্কলন অনুযায়ী মানসম্মত নির্মান সামগ্রী দিয়ে এই দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতুটি দ্রুত সময়ের মধ্যে যাতে নির্মান করা হয়
এ ব্যাপারে মাননীয় পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান মহোদয়ের সদয় হস্তক্ষেপ ও উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ সোহরাব হোসেনের সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।
জগন্নাথপুর পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ড বাসিন্দা আখলাকুর রহমান বলেন, দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতু নির্মাণে কর্তৃপক্ষের গাফলতির কারণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার সহ দেখ ভালের অভাবে কাজের ধীরগতির সৃষ্টি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে জনসাধারণের ভোগান্তি আরো বাড়বে।
স্টুডেন্ট কেয়ার জগন্নাথপুরের সাধারণ সম্পাদক আমিনুর রহমান হিমেল বলেন, সেতুটির নির্মাণ কাজ ধীরগতিতে চলায় জরাজীর্ণ ডাকবাংলো সেতু ও বিকল্প সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এতে পৌর শহরে নিত্যনৈমিত্তিক যানজট লেগেই আছে। তাই সেতুটি দ্রুত নির্মাণ করা জরুরী।
এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সাইট ম্যানেজার সাইফুল আলম বলেন, ‘নির্মানাধীন সেতুর পাশে বিদ্যুতের তার ও খুঁটি এবং পুরনো সেতু অপসারণ করতে সময় লেগেছে। এছাড়া বর্ষাকালে নদীতে পানি আসার কারণে কাজ বাধাগ্রস্থ হয়। তাই সেতুর কাজ শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, সেতুটিতে নিম্নমানের কোন নির্মান সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছেনা।
জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোঃ সোহরাব হোসেন বলেন, অনুমোদন পাওয়ার পর চলতি বছরের মার্চ মাসে আর্চ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। শুরুতেই কাজ সমাপ্তির সময়সীমা ছিল চলতি বছরের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত। কিন্তু মাটির কন্ডিশন, বর্ষাকালে নদীতে পানি আসা ও বিদ্যুৎ বিভাগের খুঁটি অপসারণ করতে কয়েক মাস সময় লেগে যায়। ব্রীজের গার্ডার, আর্চ গার্ডার, লং গার্ডার সম্পন্ন করতে আরো দু’মাস সময় লাগবে।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে সেতুটির প্রায় ৬০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
তাই আগামী বছরের এপ্রিল মাসের মধ্যে সেতুটির কাজ সম্পন্ন করার সময়সীমা বর্ধিত হয়। তবে আশা করা যাচ্ছে ফেব্রুয়ারি মাসে সেতুটি দৃশ্যমান হবে
তিনি আরো বলেন, আমরা কঠোরভাবে মনিটরিং ও তদারকি করে যাচ্ছি। এখানে নিস্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগটি সঠিক নয়। প্রতিটা সামগ্রী মানসম্মত কিনা পরিক্ষা করে দেখা হচ্ছে । মানসম্মত পাথর ও বি এস আই রড এ সেতুতে ব্যবহার করা হচ্ছে। ল্যাব এ পরিক্ষা করে রড গুলো লাগানো হচ্ছে বলেও তিনি জানান ।
Leave a Reply