সুনামগঞ্জ জেলার সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম নয়ন রায় । পুরো নাম ডাক্তার নয়ন রায়। নয়ন বাবু তার ডাক নাম। সবকিছু মিলিয়ে তিনি হলেন ডাক্তার নয়ন রায়, গ্রাম বাংলার মেহনতি সাধারণ মানুষের কাছে তার পরিচয় ছিল ‘নয়ন বাবু’ হিসেবে, সাংবাদিক ও সংবাদপত্র জগতে তিনি ছিলেন সকলের প্রিয় নয়ন দা। আর অন্যরা তাকে নয়ন বাবু বলে চিনতেন ও জানতেন।
এ নামের মানুষটি যেমন বিশাল জ্ঞান ও প্রতিভা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি বিশাল, ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল তার জীবন ও কর্ম। তিনি নিঃসন্দেহে একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ ও জাতির গর্বিত সন্তান। দেশ ও জাতির সেবায় আত্ম-নিবেদিত এ মানুষটির নাম আজ আর তেমন উচ্চারিত হবেনা এই শহরে- অথচ এদেশ, এদেশের মাটি আর মানুষকে তিনি তার কাজে-কর্মে ও চিন্তায় সম্পৃক্ত করে নিয়েছিলেন।
এ কারনেই সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কৃষি ব্যাংকের সরকারি চাকরি তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। কোন লোভ-লালসা, প্রাচুর্য্যরে মোহ তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। যশঃ ও খ্যাতির লোভে এবং কোন কিছু পাবার প্রত্যাশায় কারো পিছনে ছোটাছুটি করেননি অথবা কারো দয়া ও করুণার প্রত্যাশী ছিলেন না। সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে তিনি পূতঃপবিত্র জ্ঞান করেছিলেন বলেই এ পেশাতে জীবনের শেষ নিংশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার স্বকণ্ঠে উচ্চারিত হতে শুনেছি ‘সাংবাদিকতার মতো পবিত্র পেশা আর কি হতে পারে?
তিনি জাতীয় স্থানীয় অনেক পত্রিকায় কাজ করেছেন মৃত্যুর আগে দৈনিক আমাদের কন্ঠ ও বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, তিনি জগন্নাথপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও জগন্নাথপুর উপজেলা আওয়ামী মৎসজীবী লীগের সহ সভাপতি ছিলেন, সাংবাদিকতার পাশাপাশি হুমিও ডাক্তারি পেশায় নিয়জিত ছিলেন।
ডাক্তার নয়ন রায়,নেত্রকোনা জেলার বারহাট্রা উপজেলার রামপুর দশহাল গ্রামের নগেন্দ্র ছন্দ রায়ের ছেলে।তিনি দীর্ঘ ২৬ বছর যাবত সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর পৌর শহর এলাকা বাসুদেব বাড়ীতে বসবাস করে আসছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক ছেলে এক মেয়েসহ অসংখ্য আত্বীয় স্বজন গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। মরহুমের মৃত্যুর খবর পেয়ে শেষ বারের মতো একনজর দেখার জন্য বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ বাসায় ভিড় করেন। সাংবাদিক নয়ন রায়ের মৃত্যুতে সাংবাদিকবৃন্দসহ বিভিন্ন শ্রেণী- পেশার মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তার লেখা দেশপ্রেমমূলক কবিতা, নিয়মিত প্রকাশিত হতো। অগ্রণী এ পুরুষের জীবন ও কর্ম আজো দেশ ও জাতির অজানা রয়ে গেল।
পিতৃকুল ও মাতৃকুলের দিক থেকে নয়ন রায় দুটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের অধিকারী ছিলেন। প্রপিতামহ, পিতামহ ও পিতা এবং মাতামহ ও মাতার জীবনাদর্শের এক অপূর্ব সমন্বয়ে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। সামন্তবাদী সমাজ ও পরিবেশে লালিত, পালিত হয়েও তিনি গণমুখী এবং গণচিন্তামূলক সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
তিনি সবসময় বলতেন সামন্তবাদী পরিবেশে লালিত-পালিত হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু মনটা ছিল অশৈশব গণমানুষের সুখ-দুঃখের সাথে একাত্ম। সাধারণ মানুষের সাথে মিশে তাদের জীবন উপলব্ধির চেষ্টা করতাম।
ডাক্তার নয়ন রায় তার জীবদ্দশায় নানাভাবে এই ভূমিকাকে মূর্ত করে তুলতে চেয়েছেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে তার এই ভূমিকা অবশ্যই পথিকৃতের ভূমিকা হিসেবে উল্লেখিত হবে।………. একজন নগন্য সাংবাদিক হিসেবে মরহুম নয়ন রায় সব সময়ই মনে রাখব।
কেননা তিনি সাংবাদিকতা জগতের একজন পতাকাবাহী পুরুষ। তার স্মৃতি ম্লান হওয়ার নয়। তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমাদের শ্রদ্ধেয় অগ্রজ, তার সেই পরিচয়ই বড় ছিল আমাদের কাছে। বয়সে বড় হলেই অগ্রজের এই শ্রদ্ধা সবাই অর্জন করতে পারেন না। যার ব্যক্তিত্ব গুণটি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে, বুদ্ধি ও হৃদয়ের বিচারে যিনি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেন, বড়’র বা অগ্রজের শ্রদ্ধা তারই প্রাপ্য।
নয়ন রায় এই ব্যক্তিত্বটি একটু প্রখরভাবেই চোখে পড়ত। তার কথা বার্তায় মধ্যমাকৃতির সুপুরুষ ব্যক্তিটিকে দেখামাত্র চেনা যেত ইনি আর দশজনের চেয়ে আলাদা।
একজনকে সম্মান করে শ্রদ্ধা জানিয়ে বড় ভাই ডেকে নিজেও আনন্দ পাওয়া যায়।নয়ন দা আমাদের কাছে আনন্দের এই উৎস ছিলেন বরাবর।
……..যারা নয়ন রায়কে ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, তারাই সব কিছুর ঊর্ধ্বে এই কথাটা স্বীকার করবেন যে, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথী হওয়াই ছিল তার জীবনের আদর্শ। সাংবাদিকতার পেশায় থেকে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ, দুর্ভোগ- দৈন্যের কথা বলা যায় না। নয়ন ভাই তার সেই কর্তব্য সাংবাদিক হিসেবে কতটা করতে পেরেছেন, যে মূল্যায়ন স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয়।’ প্রকৃত পক্ষে নয়ন রায় বিশালতার পরিমাপ সহজসাধ্য নয়।
নয়ন দা তার সাংবাদিকতা জীবনে সহকর্মী তথা সহযোদ্ধাদের কাছে কতটা আত্মার-আত্মীয় ছিলেন কথায় বুঝা যেতো।
হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০২২ সালের ২৯ জুলাই তিনি জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সাংবাদিকতার নক্ষত্র পুরুষ ডাক্তার নয়ন রায় তার উত্তরাধিকারী বর্তমান ও ভবিষ্যত সাংবাদিক ও সংবাদপত্রসেবীদের মাঝে চিরদিন বেঁচে থাকবেন- এ প্রত্যাশা করা যায়। মহান আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে নসীব করুন।
লেখক সাংবাদিক মো,আলী হোসেন খাঁন
Leave a Reply